রবিবার, ২০ নভেম্বর, ২০১১

অর্ধ-সমাপ্ত স্বর্গ

অর্ধ-সমাপ্ত স্বর্গ
~~~~~~~~~~~~
ভীরুতা খুঁজেছে নিজ পথে পথ। 
বিষাদ খুঁজেছে নিজ পথে পথ ।
শকুনের ডানায় ওর নিজ ঠিকানা।

আকুল আলো খোলা প্রান্তরে আজ মুক্ত,
এমনকি প্রেতাত্মাদের হাতেও মদের গ্লাস।  

হাওয়ায় শ্বাস নেয় আমাদের ছবি,
তুষার-যুগের স্টুডিও-তে আঁকা লাল রঙের জন্তু ওসব 

শেষে সব পথের মোড়-ই ঘুরে যায়।
সূর্যের দিকে দলে দলে তখন আমরা। 

প্রতিটি মানুষ এক ভেজানো দরজা
সকলের জন্য কোন এক ঘরের ভিতর হেঁটে গেছে । 

পায়ের নিচেই অশেষ প্রান্তর। 

গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে চিকচিকে জল। 

ওই লেক – পৃথিবীরই জানালা। 

(রবার্ট ব্লাই-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে)

জঙ্গলের ভিতর সে এক জায়গা আছে


~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ওই পথে যেতে গিয়ে একজোড়া চমকে ওঠা পাখা পত্‌পত্‌ শব্দ করে উঠল। শুধু সেটুকুই। তুমি একা গেলে সেখানে। দেখলে এক উঁচু দালান দাঁড়িয়ে আছে, পুরো শরীর ভরা তার অজস্র ফাটল। এ এমন এক দালান যা সারাটাক্ষণই নড়বড় করছে, কিন্তু তবু তো পড়ে যাচ্ছে না কখনো। দালানের শরীরের ফাটল দিয়ে সূর্য ঢুকে পড়ে হাজার টুকরো আলো হয়ে ভাসছে। এই আলোর খেলায় মাধ্যাকর্ষণের এক উল্টো সূত্র আজ জয়ীঃ বাড়িটা আকাশের গায়ে যেন আটকানো। যা কিছু পড়বে, তা নীচে নয়, পড়বে উপরের দিকে। ওখানে ঘুরে দাঁড়াতে পার। ওখানে বুকটা নিংড়ে কাঁদতেও পার তুমি। হতে পার সিন্দুকের ভিতর লুকিয়ে ভাঁজ করে তুলে রাখা কোন পুরনো সত্যর মুখোমুখি। যে ভূমিকাগুলোয় এতদিন ধরে অভিনয় করে চলেছি আমি, অনেক গভীর থেকে তারা সব ভেসে উঠছে। তারপর মরার খুলির মত ঝুলে থাকছে সুদূর, নির্জনে কোন মিলানেশীয় ছোট দ্বীপে। পূর্বপুরুষের ফেলে আসা এক কুঁড়ে-ঘরের ভিতর। জীবনের ওইসব ভয়াবহ,বিভীষিকাময় স্মৃতিচিহ্নের চারপাশ ঘিরে তারপর এক নিষ্পাপ, অলৌকিক আভা ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। জঙ্গলের ভিতর ঠিক এমনই নরম, কোমল সবকিছু।
(রবিন ফুল্টন-এর করা ইংরেজি অনুবাদ থেকে)


ম্যাড্রিগ্‌ল্
~~~~~~~~
এক অন্ধকার জঙ্গলের উত্তরাধিকার পেয়েছি আমি। যেখানে খুব কদাচিৎ যাই। কিন্তু এমন একদিন আসবে যেদিন মৃত আর জীবিতরা তাদের জায়গা বদল করবে। সেদিন নড়েচড়ে উঠবে জঙ্গল। আমরা তো স্বপ্নহীন নই। সব কড়া চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক পাপের কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং একইভাবে আমাদের জীবনের অনেক মহৎ প্রেম অপূর্ণ আর পথহীন থেকে যাবে। আমি এক অন্ধকার ঘন জঙ্গলের উত্তরাধিকার পেয়েছি। কিন্তু আজ হেঁটে চলেছি আর এক অপেক্ষাকৃত কম গভীর বনের ভিতর দিয়ে। চারপাশে অনেক জীবন্ত প্রাণী যারা সব গান গায়, নড়েচড়ে, লেজ নাড়ে আর মাটির উপর দিয়ে বুকে ভর দিয়ে হেঁটে যায়! বসন্তকাল এবং এখন বাতাসে তার এক মাতাল সৌন্দর্য। আমি বিস্মৃতির পাঠশালায় ঘুরে ঘুরে কাপড় শুকানোর দড়িতে মেলে দেওয়া এক শার্টের মত ঝুলে আছি। একইরকম শূন্য হাত।
(রবিন ফুল্টন-এর করা ইংরেজি অনুবাদ থেকে)


নীল বাড়ি
~~~~~~~~
এই রাত উজ্জ্বল সূর্যের। ঘন জঙ্গলের ভিতর দাঁড়িয়ে আছি আমি। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি এক কুয়াশা ঢাকা, নীল দেয়াল দিয়ে মোড়া আমার বাড়ি। যেন এইমাত্র মারা গেছি আমি, আর এক নতুন চোখ নিয়ে দেখছি নিজ ঘর। আশিটি গরমকালেরও বেশিদিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়ি। বাড়ির কাঠ যেন গর্ভবতী হয়েছে। চারবার আনন্দ দিয়ে, আর তিনবার বেদনায়। যখন এ বাড়ির কোন মানুষ মরে গেছে, আবার রঙ করা হয়েছে সব ঘর। যেন হৃৎপিণ্ড দিয়ে ওই মৃত মানুষটিই রঙ করেছে, শুধু হাতে তার নেই কোন তুলি।

বাড়ির বাইরে পড়ে আছে খোলা জমি। একদিন বাগান ছিল এখানে, এখন আগাছার ঝাড়। পথ আটকে দেওয়া আগাছা, প্যাগোডার মত আগাছা, উপনিষদের মত আগাছা, জলদস্যুদের জাহাজের মত আগাছা, ড্রাগনের মাথার মত আগাছা, বর্শার মত আগাছা, চারদিকে এক আগাছার সাম্রাজ্য! ভীষণ বেড়ে ওঠা গাছপালায় বাগানের উপর দিয়ে এক বুমেরাং-এর ছায়া কেঁপে, কেঁপে উঠছে। বারবার ছুড়ে মারা হয়েছে এই বুমেরাঙ। আমার বহু আগে একটি মানুষ এ বাড়িতে থাকত। প্রায় শিশুর মত। থেকে থেকে এক আকুল আবেগ ঘিরে ধরত ওকে। ছুড়ে দাও...দূরে...ভাগ্যকে জয় করে দুর্ভাগ্যের বাইরে।

বাড়িটা এক শিশুর আঁকা ছবির মত। এক ছেলেমানুষি সরলতা ঘিরে আছে সব কেননা এখানে কেউ একজন ছিল যে তার নিজ ছেলেবেলা ছেড়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল, সময়ের অনেক আগে। দরজাটা খোল ঘরে ঢোক! এ বাড়ির ছাদে অস্থিরতা আঁকা আছে, আর দেয়ালে ছড়িয়ে আছে শান্তি। বিছানার উপর ঝুলে আছে এক জাহাজের পেইন্টিং। সতেরোটা পাল তুলে চলেছে সে জাহাজ। ফুঁসে ওঠা ঢেউ-এর চূড়ায়। ছবিতে আরও আছে এক প্রবল হাওয়ার শব্দ গিলটি করা ছবির ফ্রেমে তাকে বেঁধে রাখা যায় নি।

সবসময়ই সবকিছুর শুরু এখানে। জীবনের সব দুই রাস্তার মোড়ে, সব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে। এই জীবনের জন্য ধন্য আমি! তবু বারবার অন্য না নেওয়া সবগুলো পথই তো কাঁদায়। আঁকিবুকি কাটা ছবিগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠতে চায়। জলের উপর বহুদূরে ভেসে বেড়ানো এক জাহাজের ইঞ্জিন গ্রীষ্মের রাতের দিগন্তরেখাকে যেন আরো দূরে ছড়িয়ে দেয়। আনন্দ আর বেদনা শিশিরের ম্যাগনিফাইং গ্লাসে একই সাথে ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিছু না বুঝেই আমরা ঝাঁপ দেই। আর আমাদের এই জীবনের সমান্তরালে অন্য এক জীবনের জাহাজ ভেসে চলে যায়, চুপচাপ এক আলাদা পথ ধরে। ঠিক যখন দ্বীপগুলোর পিছনে এক সূর্য আগুনের মত জ্বলজ্বল করতে থাকে।

(রবিন ফুল্টন-এর করা ইংরেজি অনুবাদ থেকে)

২টি মন্তব্য: